গল্পটা শুরু হয় যাত্রার কিছুদিন আগে থেকে।
এর আগে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকার বাইরে ঘুরতে যাওয়া হয়ে ওঠেনি কখনো। এবার যাব, ময়মনসিংহ। এসএসসি পরীক্ষার পর বন্ধু সমাজের অনেকেই দল বেঁধে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এসেছে, কিন্তু আমি গিয়েছিলাম পরিবারের সাথে। তাই ময়মনসিংহ যাওয়ার পরিকল্পনাটা আমার কাছে নিছক একটা ট্রিপ ছিল না, একটু অন্যরকম ব্যাপার ছিল।
আমরা তখন সবাই ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে, একই কলেজের ছাত্র। গন্তব্য ময়মনসিংহ শহর, আর সেখানে যাচ্ছি আমার পরম বন্ধু মারসাদের বাসায়। সঙ্গে শাহেদ আর আনান।
ময়মনসিংহে যাওয়ার জল্পনা-কল্পনা অবশ্য আজকের না। মাসখানেক কথাটা ঘুরছিল। শেষ পর্যন্ত প্রায় ১০-১৫ দিন আগে মারসাদ হঠাৎ বলল এই শীতেই যাই।
শীত বলতে অবশ্য বাংলাদেশের শীত। এক মাসের বেশি তার স্থায়িত্ব আশা করাও একটু বেশি হয়ে যায়।
যেহেতু এটা আমাদের সবারই ঢাকার বাইরে প্রথম বন্ধুবান্ধবের সাথে ট্রিপ, তাই উত্তেজনাটা ছিল যথেষ্ট। ঠিক হলো ২৫ ডিসেম্বর যাব।
ক্লাসে বসেই এসব নিয়ে আলোচনা চলছিল। সেদিন সপ্তম পিরিয়ডে বাংলা ক্লাস। আমি আর আনান ট্রিপের প্ল্যান নিয়ে কথা বলছিলাম। এমন সময় আমাদের প্রিয় বাংলা শিক্ষক, লেখক ও কবি এবং আমার মামার বন্ধু রাহাত রাব্বানী স্যার কাছে এলেন। আনান স্যারকে আমাদের ট্রিপের কথা বলতেই স্যার তাঁর নিজের এক ট্রিপের দুর্ঘটনার গল্প শোনালেন।
শুনে মনে হলো, ভ্রমণের আগে দুর্ঘটনার গল্প শোনাটা বোধহয় আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি।
যাই হোক, এবার আর কোনো বাধা-বিপত্তিই আমাদের ঠেকাতে পারবে না।
২০-২১ তারিখের দিকে মাকে ট্রিপের কথা জানালাম। মা আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসেন, তাই এত দূরে যাওয়ার কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই একটু আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য রাজি করিয়ে ফেললাম।
এর মধ্যে ২৩ ডিসেম্বর আমি আর মা একটা কাজে শ্রীপুরে গিয়েছিলাম। কাজ শেষ করতে করতে দুপুর দেড়টা। খাওয়া শেষ করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এমন সময় মায়ের ফোনে একটা কল এল।
কথা শুনে বুঝলাম, আন্টি, অর্থাৎ মারসাদের আম্মু ফোন করেছেন। আমাদের যাওয়ার কথা বলতে।
তখনও পরিকল্পনা ছিল ২৫ তারিখ সকালে রওনা হব। কিন্তু পরিকল্পনায় এবার হস্তক্ষেপ করলেন কথিত দেশনেতা। রাজপুত্র সেদিন লন্ডন থেকে দেশে ফিরবেন। ফলে ২৫ তারিখের পরিবর্তে ২৪ তারিখেই রওনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
থ্যাংক ইউ, দেশনেতা। কারণ আপনার কারণে শেষমেশ একদিনের ট্রিপ দুইদিনের হয়ে গেল।
অবশ্য প্ল্যান একদিন এগিয়ে আসায় আমাদের হাতে প্রস্তুতির সময়ও কমে গেল। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক টা ছিল ময়মনসিংহে গিয়ে খালি হাতে না ওঠা। বাঙালির বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করব, অথচ মিষ্টি নিয়ে যাব না। এটা তো প্রায় সাংস্কৃতিক অপরাধ।
আমি, আনান আর শাহেদ একটা গ্রুপ চ্যাট খুলে মিষ্টি নিয়ে আলোচনা শুরু করলাম। শাহেদ অবশ্য পুরো আলোচনায় থাকতে পারল না। সে তখন মারসাদের সঙ্গে নিজের জন্য একটা জ্যাকেট কিনতে বেরিয়েছে।
শীতের প্রকোপ আমরা ঢাকাবাসী তখনও বিশেষ টের পাইনি। কিন্তু জ্যাকেট কেনার ক্ষেত্রে সাবধানতার কোনো শেষ নেই।
শেষ পর্যন্ত মিষ্টির দায়িত্ব আমার আর আনানের ওপর পড়ল। আমরা ঠিক করলাম দই, রসগোল্লা আর চমচম নেব। আমার পছন্দের ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকেই কেনা হবে।
রাত তখন ৯টা ১১।
ঠিক তখনই আনান ফোন করে বলল, “বাসার সামনে আয়। ফোনে সমস্যা হয়েছে, কল দিতে পারব না, ধরতেও পারব না।”
এমন কথা শোনার পর আর প্রশ্ন করার সুযোগ থাকে না। বের হয়ে গেলাম। রিকশায় চেপে বসলাম
আনানের বাসার সামনে গিয়ে দেখি নতুন বিপদ, আমার কাছে কোনো ভাংতি টাকা নেই। আনানকেও ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছি না। রিকশাওয়ালা মামাকে বললাম একটু অপেক্ষা করতে। তারপর আনান এলে একই রিকশায় গেলাম সিঙ্গার মোড়ের ভাগ্যকুল মিষ্টান্ন ভান্ডারে।
সিঙ্গার মোড়েই একটা মুচির দোকান ছিল। আনান সেখানে নিজের স্যান্ডেল জোড়া কালি করিয়ে নিল।
মিষ্টি কিনে সেগুলো বাসায় নিয়ে ফিরতে ফিরতে রাত প্রায় ১০টা ১৫।
এরপর শুরু হলো ব্যাগ গোছানো।
ব্যাগ গোছানোর ব্যাপারে আমি ভয়াবহ খুঁতখুঁতে। ফলে ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই রাত সাড়ে ১১টা। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে ঘুমাতে গেলাম প্রায় রাত ১২টার দিকে।
পরদিন সকাল পৌনে ৬টার মধ্যেই গাড়ি আসবে। সাতটার মধ্যে রওনা দেওয়ার কথা।
ঘুমটা তাই খুব একটা আরামদায়ক হলো না।
২৪ ডিসেম্বর
সকাল সকাল গোসল-টসল শেষ করে যাত্রা শুরুর আগে মায়ের শেষ মুহূর্তের উপদেশ শুনে নিচে নামলাম। বাকি তিনজন এরই মধ্যে গাড়িতে উঠে আমার বাসার নিচে চলে এসেছে। মা-ও নিচে এলেন। মিষ্টিগুলো গাড়িতে তুলে দিলেন।
সকাল ৭টা ১০ মিনিটে আমরা রওনা দিলাম।
সেদিন কলেজ ছিল। কলেজে কাউকে না জানিয়েই এসে পড়লাম।
সকাল ৭টা ৫৮ মিনিটে পৌঁছে গেলাম রাজেন্দ্রপুরের হোটেল নিরিবিলিতে। নাস্তা করার জন্য গাড়ি থামল।
শীতের সকাল। আর আমরা চারজন এমন একটা নাস্তা করলাম, যে শীত আগামী বেলা পর্যন্ত আমাদের কাবু করতে পারবে না।
পরোটা, গরুর মাংস, নিহারি, চিকেন স্যুপ, কলিজার সবই হলো। সবশেষে বাইরে একটা টং দোকান থেকে চা।
তারপর চারজনের একটা ছবি তুলে স্টোরি দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলাম—
আমরা ময়মনসিংহের পথে।
মাওনা চৌরাস্তা পার হয়ে ভালুকার দিকে যেতে যেতে কুয়াশা আরও ঘন হয়ে উঠল। রাস্তায় ভিজ্যবলিটি খুবই কম। একটা জায়গায় গাড়ি দাড় করালাম। অপূর্ব! এক পাশে পুকুর, মাঝে N3 Highway, অন্য পাশে গাছপালা। গাড়ি থেকে নেমে সেই দৃশ্যটা বেশ উপভোগ করছিলাম।
মারসাদের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেলা সাড়ে ১১টা।
আমরা নাস্তা করেছি জানানো সত্ত্বেও আন্টি অনেক কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছেন, মাতৃহৃদয়! আতিথেয়তার কাছে যুক্তি চলে না। তাই অল্প কিছু খেয়েই বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম।
আমার আবার সকালে কফি না হলে চলে না। কফির জন্য মনটা কেমন কেমন করছিল। মারসাদকেও এ নিয়ে কয়েকবার বিরক্ত করেছি।
সিদ্ধান্ত হলো, আগে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই, তারপর চা-কফি হবে।
মারসাদের গাড়ি নিয়েই বের হলাম। রুটিওয়ালা পাড়া মোড় থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল আরেকজন- মারসাদের কাজিন সিয়াম। ঢাকায় এর আগে ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল।
মারসাদের কাছ থেকে জানলাম, সিয়ামের নাকি বাংলা গানের লেজেন্ডারি একটা প্লেলিস্ট আছে।
প্লেলিস্ট চালু হলো।
বাংলা গানের সঙ্গে ময়মনসিংহের রাস্তায় আমাদের যাত্রা চলতে লাগল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর রেললাইনের ধারে জব্বারের মোড়ে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে থামলাম। চা খেলাম, কিছু ছবি তুললাম। তারপর আবার বেরিয়ে পড়লাম।
এবার গন্তব্য শুটিয়াখালি সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট।
জায়গাটা বেশ ভালো লেগেছিল। অনেকটা জায়গাজুড়ে সারি সারি সোলার প্যানেল। আশেপাশে প্রায় কোনো মানুষজনও নেই। একটা অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ।
সেখান থেকে আবার মারসাদের বাসায় ফিরে এলাম।
দুপুরে বিশাল আয়োজন।
খাওয়ার আগে আংকেল-আন্টি বললেন, “আগে গোসল করে নাও।”
সেদিন আমরা কেউই গোসল করতে চাইছিলাম না।
আরও মজার ব্যাপার হলো, ময়মনসিংহে থাকা পুরো সময়টাতেই আমরা একদিনও গোসল করিনি।
এটা অবশ্য তখন আমাদের কাছে কোনো সমস্যা মনে হয়নি।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে বিকেল ৩টার দিকে আবার বের হলাম।
এবার গন্তব্য বারেরা।
সেখানে মারসাদের নানাবাড়ি। আশেপাশের ইটভাটায় গিয়ে ইট তৈরির পুরো প্রক্রিয়াটাও দেখলাম। এর মধ্যেই আমরা বিভিন্ন জায়গায় কয়লা খুঁজছিলাম। বারবিকিউ করার পরিকল্পনা ছিল।
হ্যাঁ পরিকল্পনা ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত বারবিকিউ আর হয়নি।
সেখান থেকে আবার বাসায় ফিরে সন্ধ্যায় বের হলাম। এবার বাইক আর রিকশা, দুই মাধ্যমেই যাত্রা।
গন্তব্য জয়নুল আবেদীন পার্ক।
শুনলাম পার্কে একটা জায়গা আছে, নাম “Down”।
নামটা বেশ অর্থপূর্ণ। ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমে গেলে নদীর যে মাটি জেগে ওঠে, সেই জায়গাটাকেই স্থানীয় ছেলে-ছোকড়ারা Down বলে।
পার্কের পাথওয়ে থেকে প্রায় ৩০ ফুট নিচে Down। আবার এরও দুইটা অংশ। দ্বিতীয় অংশটা আরও নিচে।
উপরের অংশে কয়েকটা চায়ের দোকান, পুরি-সিঙ্গারার দোকান। শুনলাম সকালে সেখানে বাজারও বসে।
আমরা তখনও Down এ নামিনি।
অপেক্ষা করছিলাম সিয়ামের জন্য।
কিছুক্ষণ পর সিয়াম কোচিং থেকে এল। সঙ্গে তার একজন বন্ধু।
তারপর আমরা নামলাম Down-এ।
নামার পর আমি কিছুক্ষণের জন্য সত্যিই বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।
এই অনুভূতিটা ঠিক ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আনুমানিক ১৫ কিলোমিটার গতিতে দমকা বাতাস এসে গায়ে লাগছিল। শীতের রাতের সেই হাড় কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস। মাথার ওপর সুন্দর, সরু, বাঁকা চাঁদ। পাশে ব্রহ্মপুত্রের মৃদু শব্দ। হাতে লেবু চা। আর সঙ্গে নিজের প্রিয় মানুষগুলো।
সেই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল, এখানে এসে দাঁড়ালে পৃথিবীর কোনো দুশ্চিন্তা, কোনো কাজ, কোনো টানই মানুষকে কাবু করতে পারবে না।
ময়মনসিংহে পুরো যাত্রার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনে গেঁথে আছে Down-এ কাটানো সেই সময়টা।
সেখান থেকে ফিরতে ইচ্ছা করছিল না।
কিন্তু রাত অনেক হয়ে যাচ্ছিল।
উপরে উঠে রিকশা-বাইক যোগে চলে গেলাম গাঙ্গিনাপাড় ট্রাফিক মোড়ে। সেখান থেকে আমি একটা রিং আর ব্রেসলেট কিনলাম।
তারপর রাতের খাবারের জন্য রওনা দিলাম Sarinda Sobari Resort-এর দিকে।
শুনেছিলাম জায়গাটা খুব একটা সুবিধার না।
রাত তখন প্রায় ৯টা ১৫।
অন্ধকার, নির্জন আর খানিকটা ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে অদ্ভুত একটা থ্রিল কাজ করছিল। যদিও এ ধরনের অভিজ্ঞতা আমার একেবারে নতুন নয়।
Sarinda Sobari-তে পৌঁছাতে রাত সাড়ে ৯টার কিছু বেশি।
রিসোর্টের ভেতরটা ঘুরে দেখলাম, ছবি তুললাম। জায়গা টা সুন্দর, গতানুগতিক রিসোর্টের চেয়ে একটু আলাদা। যাইহোক তারপর Cherry Pick-এ বসে আড্ডা আর খাওয়া-দাওয়া শেষ করতে করতে রাত ১১টা ২০।
এবার ফেরার পালা।
শীতের রাতে বাইক চালানো এমনিতেই কষ্টকর। তার ওপর এত রাতে, এত ঠান্ডায়, এই জায়গা থেকে বাইকে ফিরতে হবে। খুব একটা ভালো ঠেকলো না ব্যাপারটা।
তাই মারসাদ ওদের গাড়ি আনানোর ব্যবস্থা করল। আসতে প্রায় ২০ মিনিট লাগবে।
আমরা রিসোর্টের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম।
পুরো রিসোর্টে তখন স্টাফ আর সিকিউরিটি গার্ড ছাড়া আর কেউ নেই।
একজন সিকিউরিটি গার্ড বললেন, “ভিতরে এসে দাঁড়ান।”
আমরা গেটের ভেতরে ঢুকলাম।
তারপরই আরেক দফা বাতাস এসে শরীরের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিল।
সিকিউরিটি গার্ডদের কাছে দেখলাম দুটো Japanese Spitz।
কিছুক্ষণ পর গাড়ি এল। যে লোক গাড়ি নিয়ে এসেছিল, তার কাছে বাইক দিয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে বাসায় ফিরে গেলাম।
সেদিন আমরা ভারী ক্লান্ত ছিলাম।
বাসায় গিয়ে চার মূর্তি একই রুমে ঘুমিয়ে পড়লাম।
২৫ ডিসেম্বর
আমার ঘুম ভাঙল সকাল ৭টার একটু আগে।
আমি উঠার পর একে একে বাকিরাও জেগে উঠতে শুরু করল।
চোখ-মুখ ধুয়ে আবার বের হয়ে পড়লাম জয়নুল আবেদীন পার্কের দিকে।
সকালের গন্তব্য, থুক্কু, উদ্দেশ্য-খেজুরের রস।
সকাল সাতটার দিকে খেজুরের রস খেলাম। তারপর দ্বিতীয়বারের মতো নামলাম Down-এ।
গত রাতে শুনেছিলাম সকালে সেখানে বাজার বসে।
আজ চোখে দেখলাম।
বাজারটার সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় ছিল এর একটা আলাদা চরিত্র আছে। শহরের ভেতরেই নদের ধারে একটা গ্রাম্য বাজার।
নদের ওপারের মানুষজন নিজেদের চাষ করা শাকসবজি, ফল, পালন করা হাঁস-মুরগি নিয়ে এসে এখানে বিক্রি করে।
একটা শহরের ভেতরেই এমন একটা বাজার থাকবে, সেটা বেশ মজার ব্যাপার।
বাজার ঘুরে দুটো ছোট পুরি আর চা নিলাম।
চা-টাঅবশ্য গত রাতের চায়ের মতো জমল না।
তারপর নদের একদম ধারে গিয়ে কিছুক্ষণ গল্প করলাম।
উপরে উঠে বাসায় ফিরে নাস্তা করলাম।
এরপর আবার বের হলাম।
এবার শহরের বাইরে। গন্তব্য ত্রিশাল থানার ধানীখোলা ইউনিয়ন—মারসাদের দাদাবাড়ি।
সকাল ১১টা ১৫ মিনিটের দিকে রওনা দিলাম। এক ঘণ্টারও কম সময়ে পৌঁছে গেলাম।
ধানীখোলা বেশ মনে ধরল।
মারসাদের দাদাবাড়ি দেখার পর একটা অটোভ্যান নিয়ে বের হলাম। চালক অবশ্য সঙ্গে নেই।
আমরাই চালাব।
ধানীখোলার ভেতর ঘুরতে ঘুরতে প্রথমে গেলাম ওদের ফিশারিজে। জায়গাটা বেশ শান্ত। কয়েকটা ভেড়াও ছিল।
সেখান থেকে প্রায় ১৫ মিনিট পর আরও ভেতরের দিকে গেলাম।
দুপাশে ক্ষেত, মাঝখানে রাস্তা।
মারসাদ ভ্যান চালাচ্ছিল। পরে আমিও চালালাম।
জীবনে অনেক ধরনের যানবাহন চালানোর অভিজ্ঞতা হয়েছে।
সেদিন ভ্যান চালানোর অভিজ্ঞতাটাও যোগ হলো।
পথে দেখা হলো এক অদ্ভুত চরিত্রের সঙ্গে।
একাধারে কবি, সাহিত্যিক, শায়ের, গায়ক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, পীর, আরও কত কী গুণে গুণান্বিত-আকরাম পাগলা।
লোকটা বেশ ইন্টারেস্টিং।
তাঁর কাছ থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও পেলাম।
১৫০০ টাকা দামের Seiko 5 ঘড়ি পরলে নাকি ভাগ্য পরিবর্তন হয়।
জীবনে এতদিন আমরা ভুল জিনিসের ওপর ভরসা করে এসেছি, সেটা তখন বুঝলাম।
ধানীখোলা থেকে আবার ময়মনসিংহ শহরে ফিরলাম।
দুপুরের খাবার শেষ করে একটু দেরিতে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত হলো। এর মধ্যে মারসাদের আরেক কাজিনের সঙ্গে পরিচয় হলো—তাইফ ভাই।
তারপর আমরা আবার বের হলাম।
এবার উদ্দেশ্য, ময়মনসিংহ শহরটা একটু ঘুরে দেখা।
চড়পাড়া, কাচারী রোড, আনন্দমোহন কলেজ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ—যেখানে আমার মা পড়াশোনা করেছেন।
আনন্দমোহন কলেজের ভেতরে একটা পুকুরের পাশে কিছুক্ষণ বসেছিলাম।
সন্ধ্যা অনেক আগেই নেমে গেছে।
দেখতে দেখতে আবার Down-এ।
এবার অবশ্য বেশি সময় থাকলাম না।
তারপর গেলাম মিন্টু কলেজের দিকে। সেখান থেকে সিয়াম আমাদের নিয়ে গেল CK Ghosh Road-এর Mr. Savory-তে।
রাতের ভোজ সেখানেই হলো।
এরপর মারসাদের একটা কাজ পড়ে গেল। তাই তাইফ ভাই আমাদের নিয়ে গেলেন থানার ঘাটে, চা খেতে।
যেতে গিয়েই বুঝলাম, রিকশাওয়ালা মামা আমাদের শর্টকাট দিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
এত চিপা গলি আর এত ঝাঁকি খেতে খেতে মনে হচ্ছিল, শর্টকাটটা আসলে আমাদের… থাক
থানার ঘাটে পৌঁছে আমরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে নামলাম।
আমি আর শাহেদ যখন আমাদের কাজ করছি, পাশেই দেখি ধোঁয়ার সঙ্গে গভীর সম্পর্কে থাকা এক উচ্চমনা ভদ্রলোক নিজের চারপাশের মনোরঞ্জক পরিবেশ তৈরিতে ব্যস্ত।
আমরা আমাদের কাজ শেষ করে চা নিলাম।
চা খেতে খেতেই মারসাদ এসে পড়ল।
তারপর চলে গেলাম কাচিঝুলি মোড়ে।
রাত বেশ হয়ে গেলেও জায়গাটা তখনও জমজমাট। অনেক মানুষ, দোকানপাট, আড্ডা।
দীর্ঘক্ষণ সেখানে বসে আড্ডা দিলাম।
পরে রাস্তার পাশের একটা স্ট্রিট ফুডের দোকান থেকে স্যুপ খেলাম।
তারপর আবার এক দফা চা।
রাত অনেক হয়ে যাওয়ায় বাসায় ফিরে এলাম।
মারসাদের বাসার ঠিক বিপরীতে একটা ফাঁকা প্লট। সেখানে দেখি কয়েকজন বাচ্চা ছেলে ব্যাডমিন্টন খেলছে।
আমরা গিয়ে ওদের সঙ্গে কিছু আলোচনা করলাম, যার ফলে শেষ পর্যন্ত ১০ পয়েন্টের একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ পেলাম।
প্রায় ৪৫ মিনিট খেলার পর ব্যাট-ফ্লাওয়ার সবকিছু নিয়ে তারা নিজেদের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করল।
খেলার সময়ই আমি একটা মালয়ালম সিনেমা, Punyam Aham, ডাউনলোড করে রেখেছিলাম। পরিকল্পনা ছিল ঘুমানোর আগে টিভিতে বসে সিনেমাটা দেখব।
সিনেমা শুরু হলো।
পাঁচ মিনিটও হয়নি।
শাহেদ ছাড়া আমরা সবাই ঘুমের রাজ্যে।
২৬ ডিসেম্বর
আজ ঢাকায় ফেরার দিন।
ঘোরাঘুরির সুযোগ নেই। দুপুর ১২টার আগেই গাড়ি এসে পড়বে।
আংকেল-আন্টি আমাদের সবার বাসার জন্য ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি কিনে দেবেন বলে ঠিক করেছেন।
মারসাদ আমাদের নিয়েই মিষ্টি কিনতে বের হলো।
মিষ্টি কানন থেকে মিষ্টি কেনা হলো। এরপর একটু ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঢুঁ মারার চেষ্টা করলাম।
শুক্রবার হওয়ায় অবশ্য ভেতরে ঢুকতে পারলাম না।
বাসায় ফিরে ব্যাগ গোছাতে গোছাতেই গাড়ি এসে পড়ল।
বিদায় নেওয়ার সময়টা একটু অন্যরকম ছিল।
দুই দিনের জন্য যে বাড়িটা, যে শহর টা আমাদের কাছে প্রায় নিজেদের বাড়ি, নিজেদের শহরের মতো হয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে বের হয়ে আবার ঢাকার পথে।
নিচে নেমে গাড়িতে উঠলাম।
প্রায় ১২টার দিকে রওনা দিলাম।
জ্যাম খুব একটা পেলাম না, তবে গাড়ির চাপ ছিল ভালোই।
মাস্টারবাড়ি, ভাওয়াল ফিলিং স্টেশনের পাশে একটু চায়ের বিরতি নিলাম।
এরপর গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে গাড়িতে গ্যাস নেওয়ার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল ফিজিশিয়ান ও জনপ্রিয় অভিনেতা ডা. এজাজুল ইসলামের সঙ্গে।
কথা বললাম, ছবি তুললাম।
এর মধ্যেই আমাদের গাড়ির গ্যাস নেওয়াও শেষ।
তারপর আর প্রায় ৩০ মিনিট।
আমরা আবার নিজেদের শহরে।
বাসায় ফিরে বুঝলাম, ট্রিপ শেষ।
কিন্তু গল্পটা শেষ হয়নি।
কারণ কিছু ভ্রমণ জায়গার জন্য মনে থাকে, কিছু মানুষগুলোর জন্য, আর কিছু থাকে এমন কিছু ছোট ছোট মুহূর্তের জন্য যেগুলো তখন খুব সাধারণ মনে হলেও পরে হঠাৎ মনে পড়ে যায়।
ময়মনসিংহের এই তিন দিন আমার কাছে ঠিক তেমনই একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে।
চারজন বন্ধু, একটা গাড়ি, কয়েকটা বাইক-রিকশা, অগণিত চা, অস্বাভাবিক পরিমাণ খাবার, কিছু মানুষ, একটা Seiko 5-এর ভাগ্য পরিবর্তনের তত্ত্ব, আর সবকিছুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি—ব্রহ্মপুত্রের ধারে সেই Down।
এই ছিল আমাদের গল্প।
চার পথিক, এক পথ।